জামায়াতের সঙ্গ না ছাড়ায় বিএনপিকে বিশ্বাস করছে না ভারত

নিউজ ডেস্ক: দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর সব চেষ্টা করেও সফল হয়নি। জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ না করাকেই এ ব্যর্থতার প্রধান কারণ বলে উল্লেখ করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক সঞ্জীব দেব। তিনি বলেন, প্রায় সাড়ে চার বছর আগে দিল্লিতে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার সময় থেকেই ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে কম চেষ্টা করেনি বাংলাদেশের বিরোধ দল বিএনপি। ভারতে ক্ষমতাসীন বিজেপি ও তাদের আদর্শিক অভিভাবক আরএসএস নেতাদের কারও কারও বিএনপির প্রতি কিছুটা সহানুভূতি থাকলেও জামায়াতের কারণে দলটির সুসম্পর্ক সম্ভব হয়নি।

ভারতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার একজন বিজেপি সদস্য যিনি বাংলাদেশ বিষয়ে নিয়মিত খোঁজখবর রাখেন তার বক্তব্যকে কোট করে সঞ্জীব দেব বলেন, ওই বিজেপি সদস্যের বক্তব্য হচ্ছে, বিএনপি তাদের পুরনো ভারতবিরোধী নীতির বদলে দিল্লির সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক শুরু করতে চেয়েছে, সেটাকে আমরা ইতিবাচক দৃষ্টিতেই দেখেছিলাম। কিন্তু সমস্যা হলো—  মুখে তারা যা-ই বলুক, জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক ছাড়তে যে বিএনপি প্রস্তুত নয়, সেটারও অনেক প্রমাণ আমরা পেয়েছি।’

আর ঠিক সে কারণেই বিএনপির হাজারো চেষ্টা সত্ত্বেও দিল্লির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কিছুতেই দানা বাঁধলো না। কিন্তু প্রশ্ন হলো— জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির ঘনিষ্ঠতার কী ধরণের প্রমাণ পেয়েছে ভারত?

বিশ্লেষক সঞ্জীব দেব ভারতের গোয়েন্দা সূত্রগুলোর অনুসন্ধানী তথ্য উল্লেখ দেশটির সাথে সুসম্পর্ক তৈরিতে বিশেষ কয়েকটি প্রতিবন্ধকতা উল্লেখ করেছেন।

প্রথমত, তারেক-জামায়াত ঘনিষ্ঠতা: ভারতের গোয়েন্দা সূত্রগুলো জানাচ্ছে, লন্ডনে গত ১০ বছর ধরে স্বেচ্ছা নির্বাসনে থাকা বিএনপির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমান জামায়াত নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখে চলেছেন। বিভিন্ন সময়ে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন ওঠার পর তিনি প্রকাশ্যে জামায়াত নেতাদের সঙ্গে মেলামেশা একেবারেই কমিয়ে দিয়েছেন, কিন্তু গোপনে যোগাযোগ মোটেই বন্ধ করেননি।

লন্ডনে জামায়াতের কর্মকাণ্ডের প্রধান কেন্দ্র হলো— পূর্ব লন্ডনের ইস্ট লন্ডন মস্ক তথা লন্ডন মুসলিম সেন্টার, যার ট্রাস্টি বোর্ডে আছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বহু জামায়াতি নেতা। তারেক রহমান নিজে ইদানিং এই মসজিদে পা রাখেন না ঠিকই, কিন্তু এটির নেতৃত্বের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে নিবিড় সম্পর্ক রেখে চলেন। ব্রিটেনে জামায়াতের মুখপাত্র আবু বকর মোল্লা দুই তরফের যোগাযোগ রক্ষার বিষয়টি দেখাশুনো করে থাকেন, আর তারেক রহমানের তরফে জামায়াত নেতৃত্বের সঙ্গে লিয়াজোঁ বজায় রাখেন লন্ডনে তার ডান হাত বলে পরিচিত, যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি এম এ মালেক।

দ্বিতীয়ত, জামায়াতের ভোট হারাতে চান না খালেদা জিয়া: ভারতীয় কর্তৃপক্ষ নির্ভরযোগ্য সূত্রে আরও খবর পেয়েছে যে, জামায়াত আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির জোটে থাক বা না-থাক, তাদের যে ‘কমিটেড ভোট’ আছে সেটা কিছুতেই হারাতে চান না বিএনপির কারাবন্দি নেত্রী খালেদা জিয়া। তিনি নাকি নিশ্চিত, জামায়াতের ভোট তাদের দিকে এলে সেটা বিএনপির পালে জয়ের হাওয়া তুলতে সাহায্য করবে। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার একটি সূত্র জানাচ্ছে, ‘আমরা জানতে পেরেছি, জেলের ভেতরে থেকেও খালেদা জিয়া তার দলের নেতাদের নির্দেশ দিয়েছেন— জামায়াতের এই ভোট কিছুতেই হাতছাড়া করা চলবে না। বিশেষত জামায়াত নিজের প্রতীকে ভোটে লড়তে না-পারলে তাদের ভোট বিএনপির দিকেই আসবে, এই বিশ্বাস থেকেই খালেদা জিয়া জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করতে চান না।’

বাংলাদেশের নির্বাচনি ইতিহাসের তথ্য বলছে, ১৯৯১ সালে একার জোরে ভোটে লড়ে জামায়াত সারা দেশে ১২ শতাংশেরও বেশি ভোট পেয়েছিল। এমনকি ২০০১ ও ২০০৮ সালে জোটের শরিক হিসেবে অনেক কম আসনে লড়েছে তারা, তার পরেও তাদের ভোট সাড়ে চার শতাংশের আশেপাশেই ছিল। খালেদা জিয়ার দৃঢ় বিশ্বাস— জামায়াতের এই একনিষ্ঠ ভোটব্যাংক বিএনপির দিকে টেনে আনা গেলে ভোটের ‘সুইং’ অনেকটাই বদলে যেতে পারে।

তৃতীয়ত, বিএনপি-জামায়াতের বিরুদ্ধে এইচ টি ইমামের দলিল: এত কিছুর পরেও বিএনপির প্রতি ভারতীয় কর্তৃপক্ষের যদি সামান্য কোনও দুর্বলতা থেকেও থাকে, সেটাও চুরমার হয়ে গেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমামের সাম্প্রতিক দিল্লি সফরে। রীতিমতো নথিপত্র পেশ করে তিনি দিল্লির নেতৃত্বের কাছে প্রমাণ করে দিয়ে গেছেন— বিএনপির নিজের শক্তি বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই, তারা যা করছে তার সবটাই জামায়াত-শিবিরের জোরে।

মাসকয়েক আগে এইচ টি ইমামের ওই দিল্লি সফরে তার সঙ্গে বৈঠক করেছেন ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এমন এক সিনিয়র কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ‘বাংলাদেশ সরকার এটা আমাদের কাছে পরিষ্কার করে দিয়েছে, রাজপথে আমরা বিএনপির নামে যাদের আন্দোলন করতে দেখছি, তারা বেশির ভাগই আসলে জামায়াত ও ইসলামি ছাত্র শিবিরেরই লোকজন। বিএনপিকে লোকবল ও অর্থবলও যোগাচ্ছে জামায়াত, কাজেই ওই দুই দলের মধ্যে আর কোনও সম্পর্ক নেই, এটা একেবারেই মিথ্যা কথা।’

মূলত এসব কারণেই ভারত এখনও নিশ্চিত যে, বিএনপি এখনও জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গ ছাড়ার জন্য প্রস্তুত নয়, আর সেজন্যই আসন্ন নির্বাচনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ, কোনোভাবেই বিএনপির পাশে দাঁড়াচ্ছে না তারা।

শেয়ার করে সবাইকে জানিয়ে দিন :