এসকে সিনহার মতো কাপুরুষ মরে বারবার

আবদুল মালেক, উপ-সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রেস

মানুষের সব স্বপ্ন পূরণ হয়না,পূরণ হয়নি সাবেক প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহারও। তিনি স্বপ্নের  যে ছক কষেছিলেন, সৌভাগ্যক্রমে মাঝপথে হলেও বুঝতে পেরেছে শেখ হাসিনার সরকার, ফলে সেখানেই থেমে গেছে ষড়যন্ত্রের বিস্তার, সরে গেছে সাধারণ জনগন এবং উচ্চ আদালতের মধ্যে সৃষ্ট বিভেদের দেয়াল। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে কেন্দ্র করে ২০০৮ সালের পর থেকেই অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে রাষ্ট্র, সরকার, রাজনৈতিক পরিস্থিতি। ঘোলা পানিতে মাছ ব্যস্ত দেশি-বিদেশ আওয়ামী লীগ বিরোধী লবি। ঠিক সে সময়ে রাষ্ট্রে বিভেদের দেয়াল মজবুত করেছে এসকে সিনহার কিছু কর্মকান্ড। অথচ সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হতে তাকে প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগ দেয়া ছিল সময়ের সাহসী সিদ্ধান্ত। সেই এসকে সিনহাই কিনা বলে বসলেন যে তিনি শান্তি কমিটির মেম্বার ছিলেন। একজন সিটিং চীফ জাস্টিস সাংবিধানিক পদে বসে এমন খোলামেলা বক্তব্য দিতে পারেন? কে না জানে ‘রাজাকার বা শান্তি কমিটির সদস্য’ এই শব্দগুলো  মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপরীত ও ঘৃণিত শব্দ?

সম্প্রতি এসকে সিনহা ‘A Broken Dream: Rule of Law, Human Rights and Democracy’ এই নামে আত্মজীবনী লিখেছেন। বইটির প্রিন্ট কপি পাওয়া না গেলেও অনলাইনের একটি ঠিকানা আছে ইন্টারনেটে। প্রশ্ন হচ্ছে কি স্বপ্ন দেখেছিলেন সিনহা বাবু? আর তাঁর সে স্বপ্ন ভাঙ্গলোই বা কিভাবে? প্রধান বিচারপতির সুবিধা ভোগ করে আদালত, রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল ও জনগনের মনে স্থায়ী বিভেদ সৃষ্টি করতে না পারাটাই কি “স্বপ্ন ভঙ্গ’? জনাব সিনহা এদেশে জন্ম নিয়ে রাষ্ট্রীয় সব সুবিধা ভোগ করেছেন, বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে বলেই তিনি চীফ জাস্টিস হয়েছেন। পরবর্তীতে অবসরে গিয়ে এই বিরুদ্ধাচরণ কি খুব সঙ্গত হয়েছে? যদি তিনি ভাবেন তাঁর প্রতি অবিচার হয়েছে তবে দেশে থেকে তিনি কেন প্রতিবাদ করেননি? তাঁর কি জেল-ফাসি হয়ে যেতো? আর হলোই বা, তাই বলে কি মানুষ সততা আর সত্যিকার পথ থেকে বিচ্যুত হয় কখনো?

বঙ্গবন্ধু আজীবন লড়াই-সংগ্রাম করেছেন। যা সত্যি বলে জেনেছেন, ফাঁসি হতে পারে জেনেও সে পথ ছাড়েননি। ২৫ মার্চ নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও ৩২ নম্বরের বাড়ি ছেড়ে পালাননি। কিংবা হুমকী জেনেও সাদামাটা বাড়িটি ছেড়ে নিরাপদ রাষ্ট্রীয় সুবিধা নেননি। তাতে করে বঙ্গবন্ধুর মর্যাদা কি এতটুকু ক্ষুন্ন হয়েছে? ধরে নিলাম এস কে সিনহার প্রতি বর্তমান সরকার  অবিচার করেছে, কিন্তু তিনি কি দেশে বসে এর প্রতিবাদ করতে পারতেন না? এখন বিদেশের নিরাপদ মাটিতে বসে কিসের আস্ফালন করছেন? আপনার দুর্নীতি কি মানুষ জানেনা? এখন বউ আর আণ্ডাবাচ্চা ও নিজে সেইফ জোনে বসে ষড়যন্ত্রের বাকিটা সম্পন্ন করতে চান? কেন দেশে বসে মোকাবেলা করে দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারলেন না? তারমানে নিজের দুর্বলতা থলে থেকে বেরিয়ে যেতো?

আসলে দৃষ্টান্ত সবাই স্থাপন করতে জানেন না। সেদিন নন্দিনীর সাথে কথা হচ্ছিল এলোমেলো বিষয়ে। হঠাৎ তার একটি কথায় মনোযোগী হলাম। এক বখাটে নন্দিনীর এক ছাত্রীকে প্রায়শই উত্যক্ত করে, বিষয়টি প্রতিবাদী স্বভাবের নন্দিনীকে বিক্ষুব্ধ করে। না, বিষয়টি “বিনা চ্যালেঞ্জে’ যেতে দিবেনা নন্দিনী। ব্যস,আর যায় কোথায়, ভরা বাজারে বখাটে ছোকরার দফারফা করে ছাড়ল। আশেপাশের লোকজন নাখোশ, আহা! ছেলেটির মা-বাবার নিকট বিচার দিলে হতো না, ভরা বাজারে একজন শিক্ষকের এই আচরন? নন্দিনী তখন মাথা উঁচু করে বলল, “শিক্ষক বিচার দেয় না, বিচার করে”। এমন উচ্চারনে আশেপাশের জনতা ঠাণ্ডা কেউ আর টু-শব্দটি করেনি।

প্রতিবাদ তো এমনই হওয়া উচিৎ।  আড়ালে-আবডালে বসে বিড়ালের মত হাজার মিউ মিউ না করে সিংহের ন্যায় একবার গর্জন করাই শ্রেয়। জনাব সিনহা তার অপকর্ম ঢাকতে দেশ ছেড়ে পালিয়ে ইজ্জত রক্ষা করেছেন, আসলে কি তাঁর সম্মান বাঁচলো? সত্যি বলতে কি চারিত্রিক ভাবে দুর্বলেরা রুখে দাঁড়াতে জানেনা। তাদের কাছে বেঁচে থাকাই বড় কথা এবং এর জন্য এরা হাজার বার মরতে পারে “মরার আগেই”। কিন্তু নন্দিনীরা অন্য ধাতুতে গড়া, ওরা বাঁচতে জানে আবার মরতেও দ্বিধা করেনা। তারা ভাঙ্গে, মচকায় না। সাহসী নন্দিনীকে সেল্যুট আর চক্রান্তকারী সিনহাদের ধিক্কার।

লেখকঃ উপ-সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রেস