যেমন আছেন একুশে আগস্ট বোমা হামলায় আহতরা

নিউজ ডেস্ক: ২০০৪ সালের একুশে আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার পর রক্তাক্ত-বিধ্বস্ত বঙ্গবন্ধু এভিনিউ। উড়ে যাওয়া দুই পায়ের আঙুলগুলো জড়ো করার চেষ্টা করেছিলেন। এরপর আর জানেন না। পরে শুনেছেন, মৃত ভেবে আরো ১২-১৩টা লাশের সঙ্গে তাকেও ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ঢাকা মেডিকেলের মর্গে। কখন হঠাৎ মাকে ডেকেছেন মনে নেই। ক্ষীণস্বরের ওই আওয়াজ শুনতে পেয়েছিলেন লাশবহনকারী সহকর্মীরা। তারাই লাশের ভেতর জীবিত তাকে শনাক্ত করে জরুরিবিভাগে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসা সম্ভব নয় বলে ডাক্তার অস্বীকৃতি জানালে লালমাটিয়ার একটি বেসরকারি হাসপাতালে তাকে রাখা হয়। রাতেই পাঠানো হয় ভারতে।

মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসা মহানগর মহিলা লীগ নেত্রী নাসিমা ফেরদৌসী এভাবেই বর্ণনা দিলেন রক্তাক্ত একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলায় ভয়াল দুঃস্বপ্নের। দুই পা হারিয়ে আর দেড় হাজারেরও বেশি স্প্লিন্টার শরীরে নিয়ে দুঃসহ যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে আছেন তিনি। প্রতি মুহূর্তে তাকে তাড়িয়ে বেড়ায় একুশে আগস্টের সেই ভয়াবহতা।

শুধু নাসিমাই নয়, একুশে আগস্টে সেই ঘটনায় ভয়াবহ জিঘাংসার শিকার অনেকেই এখনো পঙ্গু। আবার অনেকে সেই বীভৎস ঘটনার যন্ত্রণাময় ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন শরীরে। কেউ চলৎশক্তিহীন। কেউ হারিয়েছেন দৃষ্টিশক্তি। অনেকের শরীরে রয়ে গেছে অসংখ্য স্প্লিন্টারের অস্তিত্ব। সবমিলিয়ে অসহ্য যন্ত্রণা এখনো তাদের নিত্যসঙ্গী। বিদেশে গিয়ে সুচিকিৎসার সামর্থ্য নেই বেশিরভাগেরই। সেদিনের ভয়াবহতার কথা মনে এলে আঁতকে ওঠেন এখনো তারা। সেদিনের দুঃস্বপ্ন প্রতিনিয়ত তাড়া করে ফেরে তাদের। অন্যদিকে প্রিয়জন হারানোর বেদনা বুকে চেপে বেঁচে আছেন গ্রেনেড হামলায় নিহতদের স্বজনরা। অনেক পরিবারে চলছে চরম দুর্দশা। মানবেতর জীবনযাপন এখন তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। গ্রেনেড হামলার পর থেকে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা আর্থিক সহযোগিতাসহ নিয়মিত খোঁজখবর নিয়েছেন অসহায় পরিবারগুলোর। আহতদের চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতা দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু স্মৃতি ট্রাস্টসহ ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা ফান্ডের মাধ্যমে নিহত ও আহতদের সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ জোগানো হচ্ছে।

গ্রেনেড হামলায় প্রায় পঙ্গু হয়ে যাওয়ার পরপরই ৬৯ নাম্বার ওয়ার্ড মহিলা আওয়ামী লীগের কর্মী সাবিহাকে ছেড়ে গেছেন হোটেল কর্মচারী স্বামী হেলাল উদ্দিন। সেই থেকে অন্যের বাড়িতে আশ্রিতা সাবিহার চিকিৎসা তো দূরে থাক মুখের অন্ন জোগানোই দায়। গ্রেনেড হামলায় ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যাওয়া ডানপা ও ডানহাত এখনো সেদিনের বিভীষিকার জ্বলন্ত সাক্ষী। শরীরে অসংখ্য স্প্লিন্টার এবং যন্ত্রণা নিয়ে দিন কাটছে তার। সেই ভয়াল ঘটনার শিকার হয়ে পঙ্গুত্বের বোঝা নিয়ে একরকম জীবন্মৃত হয়েই বেঁচে আছেন আরেক মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী রাশেদা আক্তার রুমা। তার দেহে ৮টি অপারেশন হলেও এখনো সর্বাঙ্গে বিঁধে রয়েছে শত শত স্প্লিন্টার। ডানপা সম্পূর্ণ অকেজো। বামপায়ে লম্বা রড লাগিয়ে দেয়া হয়েছে। সেটিও চলৎশক্তিহীন। যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে ওষুধ খেয়ে বিছানায় পড়ে থাকলেও ঘুম আসে না তার। ওষুধ কেনার সামর্থ্যও নেই। গ্রেনেড হামলার শিকার হওয়ার মাত্র কিছুদিন আগে তার স্বামীর অকাল মৃত্যু হয়েছে। ছোট দুই মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ। কোনোভাবে জীবন সংগ্রাম করে বেঁচে আছেন তিনি। সবুজবাগ থানা মহিলা আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ফাহমিদা খানম মনির দেহেও বিঁধে আছে হাজারো স্প্লিন্টার।

ঢাকা মহানগর উত্তর মহিলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদিকা ডা. লুৎফুন্নেসা সোনালীর শরীরে থাকা স্প্লিন্টার থেকে ক্যান্সারের মতো দুরারোগ্য ব্যাধির সৃষ্টি হয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ, কলকাতার পিয়ারলেস হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েও পুরোপুরি সুস্থ হতে পারেননি তিনি। তিন মেয়ে ও এক ছেলের পাশাপাশি সেই দিনের দুঃস্বপ্ন নিয়ে কাটে তার জীবন। নিজের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘রাতে এখনো ঘুমাতে পারি না। ঘুমের মধ্যে পা শক্ত হয়ে যায়, পরে তা সোজা করতে পারি না।’ শরীরে ৪০টি স্প্লিন্টার নিয়ে জীবন অতিবাহিত করছেন খিলক্ষেত থানা আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদিকা সেলিনা আক্তার। রাজধানীর গ্রিন রোডের আল-রাজি হাসপাতাল, পরে উত্তরার একটি হাসপাতালে দীর্ঘদিন চিকিৎসা নেয়ার পরও পুরোপুরি সুস্থ হতে পারেননি। মাথায় দুটি স্প্লিন্টার থাকায় অনেক সময় অজ্ঞান হয়ে যান তিনি।

রাজধানীর ১৬ নাম্বার ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক লীগ কর্মী সাজেদুল ইসলাম সবুজ। ২১ আগস্ট যার ডানপা শরীর থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। চিকিৎসা নেয়ার পর তিনি পা ফিরে পেলেও ভুলতে পারেননি সেই দিনের দুঃসহ স্মৃতি। এখনো প্রায় এক হাজার স্প্লিন্টার তার শরীরে বিঁধে আছে। এছাড়া মহিলা আওয়ামী লীগের ঢাকা মহানগর (উত্তর) শাখার সহ-সভাপতি তাহমিনা খানম, মোহাম্মদপুর ৪৩নং ওয়ার্ডের ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল কুদ্দুস সেন্টু, মহিলা আওয়ামী লীগের অ্যাডভোকেট উম্মে রাজিয়া কাজল, ঢাকা জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের মহিলা সম্পাদিকা মাহবুবা পারভীন, মহিলা আওয়ামী লীগের দৌলত আরা ও ভৈরবের নাজিমসহ পাঁচ শতাধিক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ এখনো ২১ আগস্টের নৃশংসতার ক্ষতচিহ্ন বয়ে বেড়াচ্ছেন। যাদের অনেকের কথাই খোদ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদেরও এখন অজানা।

একযুগ পরও ২১ আগস্টের হামলায় মাদারীপুরের আহত ও নিহতদের পরিবার বিচার পায়নি। আহত ৫ জন এখনো শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছেন গ্রেনেডের অসংখ্য স্প্লিন্টার। চিকিৎসার অভাবে শরীরের বিভিন্ন অংশ অকেজো হয়ে পড়ছে তাদের। ধীরে ধীরে পঙ্গু হয়ে যাচ্ছেন তারা। প্রাণ কৃষ্ণ নামে একজন চোখ হারিয়েছেন।

এদিকে বিচার না হওয়ায় নিহত ৪ জনের বাড়িতে এখনো চলছে আহাজারি। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ১২ বছর পরও দোষীদের বিচার না হওয়ায় মাদারীপুরে রাজৈর উপজেলার হোসেনপুর ইউনিয়নের চানপট্টি গ্রামে যুবলীগ নেতা লিটন মুন্সীসহ নিহত ৪ জনের পরিবারই হতাশ। দ্রুত বিচারের দাবি তাদের।

তবে নিহত লিটনের বৃদ্ধ বাবা-মা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আর্থিক সহায়তায় খুশি। প্রধানমন্ত্রীর আর্থিক অনুদানে তাদের পরিবারে কিছুটা সচ্ছলতা এসেছে। লিটনের একমাত্র মেয়ে মিথিলা মাদারীপুর শহরের একটি ভালো স্কুলে ৫ম শ্রেণিতে পড়ছে। শুধু লিটন মুন্সী নয় ওই গ্রেনেড হামলায় মাদারীপুরের এক নারীসহ আরো ৩ জন নিহত হন। এরা হলেন, কালকিনি উপজেলার কয়ারিয়া ইউনিয়নের রামারপোল গ্রামের শ্রমিক লীগ নেতা নাসির উদ্দিন, একই উপজেলার ক্রোকিরচর ইউনিয়নের মহিষমারী গ্রামের মোস্তাক আহাম্মেদ ওরফে কালা সেন্টু ও রাজৈর উপজেলার কদমবাড়ী গ্রামের সুফিয়া বেগম।