‘মেজর জিয়া সুকৌশলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি করেছেন’

 

নিউজ ডেস্ক: বাঙালি জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন। এই স্বাধীনতার জন্য ৩০ লাখ বাঙালি প্রাণ দিয়েছে। এক কোটির বেশি মানুষ ভারতের শরণার্থী শিবিরে মানবেতর জীবন যাপন করেছে। কয়েক কোটি বাঙালি প্রতিনিয়ত পালিয়ে বেড়িয়েছে। স্বাধীনতার জন্য এত বড় আত্মত্যাগ পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। সেই ইতিহাসকে বিকৃত করে মেজর জিয়া নিজের নামটি বসাতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছেন। সেসময় থেকেই স্বাধীনতার পরাজিত শক্তি সুকৌশলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি করছে। আর জিয়ার মৃত্যুর পর মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করতে বিএনপি উঠে পরে লাগে।

স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯৪৭ সালের পাক-ভারত দেশ বিভাগের আলোচনায় মেজর জিয়া ছিলেন না। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারীর ভাষা আন্দোলনে জিয়ার নাম ছিল না। এছাড়াও ১৯৫৪ সালের পাকিস্তান যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে, ১৯৫৬ সালের পাকিস্তানের সংবিধান রচনায়, ১৯৫৮ সালের আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের সময়, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনে, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলনে, ১৯৬৭ সালের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায়, ১৯৬৯ সালের এর গণ-অভ্যুত্থানে, ১৯৭০ সালের পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচন ও প্রাদেশিক পরিষদের
নির্বাচনেও মেজর জিয়া নামে কারো নাম আমাদের জাতীয় অস্তিত্বে ছিল না। তিল তিল করে ২৪ বছরে গড়ে উঠা বাঙ্গালির স্বাধিকার ও মুক্তির সংগ্রামের কোথাও জিয়া ছিলেন না।

অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, হঠাৎ একদল বর্ণচোরা বুদ্ধিজীবি স্বাধীনতার ২২ বছর পরে বিএনপিকে ক্ষমতায় বসিয়ে ঘোষণা দিলেন একজন মেজর জিয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক! এটা শুধু ইতিহাস বিকৃতি করা না, ইতিহাস নিয়ে চরম রসিকতাও বটে। বাস্তবতা হলো বঙ্গবন্ধুতেই এসে থামতে হবে স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসকে। বঙ্গবন্ধুর অস্তিত্বকে অস্বীকার করে স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাস রচনা অসম্ভব।

জানা যায়, ১৯৭১ সালে পুরো জাতি যখন পাকিস্তানি হায়েনাদের বিরুদ্ধে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে নেমেছিল, তখন এ দেশেরই কিছু কুলাঙ্গার পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল। রাজাকার, আলবদর ইত্যাদি নাম নিয়ে নিরীহ নিরপরাধ বাঙালিকে হত্যা করেছে। স্বাধীনতার পর এই কুলাঙ্গারদের নিশ্চিহ্ন না করে ক্ষমাশীল বাঙালি জাতি তাদের এ দেশে বসবাস করতে দিয়েছিল। কিন্তু তারা সেই ক্ষমার মূল্য বোঝেনি। ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মাধ্যমে আবারও তারা পাকিস্তানি ষড়যন্ত্রে যোগ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সব অর্জন ম্লান করে দেওয়ার চেষ্টা করে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করার মাধ্যমে তারা আমাদের প্রিয় বাংলাদেশকে আবারও পাকিস্তানি ভাবধারায় ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। তাদের সেই অপচেষ্টা এখনো অব্যাহত আছে। তাই স্বাধীনতার চার দশক পরে এসেও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন নতুন করে দেখা দিয়েছে। গতকালের কালের কণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, আইন কমিশন ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতকরণ অপরাধ আইন, ২০১৬’-র খসড়া চূড়ান্ত করেছে। তাতে মুক্তিযুদ্ধের স্বীকৃত ইতিহাস বিকৃতির যেকোনো অপচেষ্টাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে এবং পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও এক কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এ ধরনের ঘৃণ্য অপরাধের শাস্তি কঠোর হওয়াই বাঞ্ছনীয়। আমরা আশা করি আইনটি দ্রুততম সময়ে জাতীয় সংসদে উত্থাপন ও গ্রহণ করা হবে।

১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি মানবতাবিরোধী অপরাধ সারা পৃথিবীকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। সেই সময়ে বিশ্ব গণমাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধের সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সেসব ন্যক্কারজনক ঘটনার বহু প্রত্যক্ষ সাক্ষী এখনো জীবিত আছেন। তথ্য, উপাত্ত ও সাক্ষ্যের ভিত্তিতে দেশে যখন মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকাজ এগিয়ে চলেছে, তখন একাত্তরের পরাজিত শক্তি সুকৌশলে নানা ধরনের বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপচেষ্টা চালাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক উসকে দেওয়ার চেষ্টা করছে। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে অপমানজনক উক্তি করছে। তাদের এমন দুঃসাহসের সমুচিত জবাব দেওয়া অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। পৃথিবীর অনেক দেশেই তাদের আত্মত্যাগ, গর্ব ও অহংকার রক্ষায় এমন আইন রয়েছে। বাংলাদেশে আরো আগেই এমন আইন প্রণয়ন করা জরুরি ছিল। দেরিতে উদ্যোগ নেওয়া হলেও আমরা আশা করি, আইন প্রণয়নের সব প্রক্রিয়া দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন করে তার যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হবে। ৩০ লাখ শহীদের রক্তের প্রতি কেউ সামান্যতম অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করার সাহস যেন না দেখায়।