বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থা : অপরাজনীতির কারণ অনুসন্ধান

গুলশানে বেগম জিয়ার বাড়ি থেকে হাঁটা দূরত্বে বারিধারায় বিলাস বহুল নিজস্ব বাড়িতে প্রয়াত এলজিআরডি মন্ত্রী আবদুস সালাম তালুকদারের শ্বশুরের করণিক বর্তমানে ‘অতি ধনাঢ্য’ এম. এ. কাইয়ুম থাকেন। অথচ মার্চ ফর ডেমোক্রেসি বা অন্য কোন আন্দোলনে দেখা মিলে না এসব নেতার। বিএনপির সর্বশেষ শাসনামলে যে সব নেতা রীতিমতো আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন কাইয়ুম তাদের অন্যতম। গুলশান-বারিধারা-উত্তরায় নামে-বেনামে একাধিক প্লট ও বাড়িই শুধু নয়, অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকও বনেছেন। বিএনপিকে ব্যবহার করে কাঁড়িকাঁড়ি টাকা কামালেও খোদ বিএনপি চেয়ারপার্সনের চরম দুঃসময়ে দেখা মিলছে না কাইয়ুমের মতো অধিকাংশ বিএনপি নেতার।

ঢাকাসহ সারাদেশে বিএনপির সাংগঠনিক দুরবস্থার পেছনে দলের রাতারাতি ‘ধনাঢ্য’ নেতৃত্বই দায়ী বলে মনে করেন দলটির মাঠ পর্যায়ের কর্মী-সমর্থকরা। গত এক বছরে বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচির ব্যর্থতার কারণ কি? একাধিকবার ক্ষমতায় থাকা দলটির বড় নেতারা মাঠে নামেন না কেন? সরকার পতনের আন্দোলনে নেমে অর্জনের ঝুলি শূন্য রেখেই বিএনপির ফিরে যাওয়ার জন্য সরাসরি সাংগঠনিক দুর্বলতাকেই দুষলেন দলটির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান। একইসঙ্গে দলটির শীর্ষ নেতাদের সম্মিলিতভাবে কাজ করার অনীহাকেও ব্যর্থতার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তিনি।

বিএনপির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক ইউনিট ঢাকা মহানগর। সাংগঠনিক ব্যর্থতার কারণে নেতৃত্ব পরিবর্তন করেও কাঙ্ক্ষিত সুফল পাচ্ছে না দলটি। প্রায় এক বছর আগে ঘোষিত আংশিক কমিটিকে এখনও পূর্ণাঙ্গ করতে পারেননি নেতৃবৃন্দ। একই সঙ্গে ঢাকা মহানগরের থানা কমিটিগুলোও রয়েছে অন্ধকারে। কবে নাগাদ এসব কমিটি ঘোষণা করা হবে, তাও কেউ বলতে পারছে না। আর এসব কারণে এক ধরনের চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে মহানগর বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে।

ঢাকা সিটি করপোরেশনের আদলে ঢাকা মহানগর বিএনপিকেও দুই ভাগে বিভক্ত করে গত বছরের ১৯ এপ্রিল নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্বাক্ষরিত গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বিদায়ী কমিটির সদস্য সচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেলকে সভাপতি করে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখার ৭০ সদস্যের আংশিক কমিটি দেওয়া হয়। একইভাবে এমএ কাইয়ুমকে সভাপতি করে উত্তর শাখায় ৬৬ সদস্যের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। আংশিক কমিটির নেতাদের এক মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। তবে দলীয় কোন্দলসহ নানা প্রতিকূল পরিবেশের কারণে প্রায় তিন বছরেও তারা পূর্ণাঙ্গ কমিটি দিতে পারেনি।

নাম প্রকাশ না করে মহানগর বিএনপির একজন নেতা জানান, ঢাকা মহানগর বিএনপির কমিটি মূলত যোগ্যতার ভিত্তিতে করা হয়নি। গ্রুপভিত্তিক কোটা প্রথায় কমিটি গঠন করায় আজকের সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। যাকে অনেকে ভাগ-ভাটোয়ারার কমিটি বলে থাকেন। আর এ কারণে এই কমিটিকে এখনও সক্রিয় করা সম্ভব হয়নি। জনশ্রুতি আছে, বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরে এমপি, মন্ত্রী হওয়ার পর তারা নামে-বেনামে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন এবং অতিমাত্রায় বিলাসী জীবন-যাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এরশাদের সময় গ্রেপ্তার আতঙ্ক না থাকলেও এই নেতারা এখন আর গ্রেপ্তার হতে চান না। কেন? বিএনপি নেতাকর্মীরাই বলছেন, আগে অঢেল সম্পদ না থাকায় তা রক্ষার চিন্তা ছিল না। কিন্তু এখন সম্পদ রক্ষার চিন্তাতেই অধিকাংশ সময় ব্যস্ত থাকেন দলের নীতিনির্ধারক বলে পরিচিত বেশিরভাগ নেতা।

বিএনপির মাঠ পর্যায়ের অধিকাংশ নেতা-কর্মীদের বিশ্বাস, আন্দোলন করে সরকারের পতন ঘটিয়ে তাদের কোনো ব্যক্তিগত অর্জন হবে না। বরং এর ফসল খাবেন দলের তথাকথিত এক শ্রেণীর নেতারা। যারা সরকারবিরোধী আন্দোলনে কোনো ভূমিকা না রেখে দল ক্ষমতায় এলে সরকার ও দলের প্রধান মুখ হয়ে যান। উদাহরণ হিসেবে বিএনপিতে এখন মোসাদ্দেক আলী ফালুর নাম বার বার উচ্চারিত হচ্ছে। বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তাকে ছায়ার মতো ঘিরে থাকতেন মোসাদ্দেক আলী ফালু। একাধিক শিল্প প্রতিষ্ঠান টিভি চ্যানেলসহ দেশে ও বিদেশে নামে বেনামে অঢেল সম্পদ রয়েছে তার।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিএনপির সাংগঠনিক বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হলো দলের মধ্যে চলতে থাকা দ্বৈতশাসন। বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের অনেকেই এখনও দলীয় কর্মকাণ্ডে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না বলে জানা গেছে। কারণ দলে অপেক্ষাকৃত তরুণ বলে পরিচিত যে নেতারা তারেক রহমানকে ঘিরে ছিলেন তাদের অধিকাংশেরই প্রাধান্য এখনও স্পষ্ট। উপর মহলে এই বিভাজনকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ফখরুল আর রিজভী। দুইজন এখন প্রকাশ্যেই দুই মেরুর রাজনীতি করছেন। আর মওদুদ-মোশাররফ-আব্বাস দ্বন্দ্ব তো আছেই। এক কমান্ড বিহীন, নেতাশূণ্য, কর্মচারী  নির্ভর দল এখন বিএনপি।

আসন্ন নির্বাচন উপলক্ষ্যে দলকে ঢেলে সাজানোর বিস্তর পরিকল্পনার কথা জানালেও কাগজে কলমে তার নজির নেই। আর তাই নিত্য নতুন টালবাহানা ও নির্বাচনকে  প্রশ্নবিদ্ধ করার অপরাজনীতির দিকে ধাবিত হচ্ছে বিএনপি। দেশ ও মানুষের স্বার্থে, গণতন্ত্রের স্বার্থে তাই এমন রাজনৈতিক চর্চা থেকে বিএনপিকে সরে আসার তাগিদ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।