৪ আগস্ট ঘটে যাওয়া সকল ঘটনা

 

নিউজ ডেস্ক: বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থী নিহতের প্রতিবাদে সপ্তম দিনেও রাজধানীতে বিক্ষোভ ও চালকদের লাইসেন্স পরীক্ষার পাশাপাশি ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহারে পথচারীদের উৎসাহিত করেছেন শিক্ষার্থীরা। আন্দোলন পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও ৪ আগস্টে কিছু অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটে। যা আন্দোলনের ভাবমূর্তিকে কিছুটা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

রাজধানীর বিভিন্ন জায়গার মতো ৪ আগস্টেও বেলা ১১টার দিকে মিরপুর-২ থেকে শত শত শিক্ষার্থী মিছিল নিয়ে এসে গোলচত্বরে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করে তারা। হঠাৎ মিরপুর বাংলা কলেজের সামনে একটি বড় ট্রাক থেকে নতুন স্কুল ড্রেস পরিহিত ১০০ থেকে ১৫০ জন শিক্ষার্থী নেমে আসে। এসময় তারা সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান তুলতে তুলতে মিরপুর গোলচত্বরে গিয়ে আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে যোগ দেয়। এমনকি তারা উগ্র মৌলবাদী স্লোগান দিয়ে ছাত্রদের রাগাণ্বিত করার চেষ্টা করে।Image result for ঝিগাতলায় শিক্ষার্থীদের অবস্থান

একই দিনে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দলীয় কার্যালয়ে হামলা করা হয়। এর দায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে আন্দোলনকে ব্যবহার করতে শুরু করতে তৎপর হয় স্বার্থান্বেষী মহল। অন্যদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ফোনালাপের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে উসকে দেয়ার ষড়যন্ত্র ফাঁস হয়ে যায়। অপরদিকে নিরাপদ সড়কের দাবিতে চলমান আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন ধরণের উস্কানিমূলক পোস্ট ছড়াতে থাকে ২৯টি ফেসবুক আইডি। আইডিগুলো থেকে আওয়ামী লীগের ধানমন্ডি কার্যালয়ে চারজন ছাত্রীকে আটকে রাখা ও ধর্ষণ এবং একজন ছাত্রের চোখ উঠানো হয়েছে বলে স্বার্থান্বেষী মহল ফেসবুকে দুটি ভুয়া ভিডিও প্রচার করে। ভিডিও দুইটির মধ্যে একটি হচ্ছে অভিনেত্রী কাজী নওশাবা আহমেদের ফেসবুক লাইভ। তিনি দুপুরে লাইভে এসে বলেন, ‘জিগাতলায় আমাদের ছোট ভাইদের (শিক্ষার্থী ইঙ্গিত করে) একজনের চোখ তুলে ফেলা হয়েছে। আর চারজনকে মেরে ফেলা হয়েছে। একটু আগে ওদেরকে অ্যাটাক করা হয়েছে। ছাত্রলীগের ছেলেরা সেটা করেছে। প্লিজ-প্লিজ ওদেরকে বাঁচান। তারা জিগাতলায় অবস্থান করছে। আপনারা এখনই রাস্তায় নামেন। বাচ্চাদের নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যান, এটা আমার রিকোয়েস্ট। বাচ্চাগুলো নিরাপত্তাহীনতায় আছে। আপনারা প্লিজ কিছু একটা করেন। আপনারা সবাই একসাথে হোন।’

তবে ফেসবুকে শিক্ষার্থীদের আটকে রাখা বা চোখ তুলে নেয়া নিয়ে যেসব প্রচারণা চালানো হয়েছে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়। গুজব ছড়ানোর পর একজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার নেতৃত্বে পুলিশ বাহিনী আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের নিয়ে ঘটনাস্থলে যায় এবং ওই কার্যালয়ের প্রতিটি কক্ষ তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখা হয়। কিন্তু কিছুই খুঁজে পাওয়া যায়নি। পরে পুলিশের সঙ্গে এসে আওয়ামী লীগ কার্যালয় পুরোটা ঘুরে শিক্ষার্থীরা এটাকে গুজব বলে স্বীকার করে।Image result for ঝিগাতলায় শিক্ষার্থীদের অবস্থান

গুজব ছড়ানো ফেসবুক ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সিটিটিসি’র সোশ্যাল মিডিয়া মনিটরিং টিম। এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, সড়ক দুর্ঘটনায় দুই জন শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনায় চলমান আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ফেসবুক, টুইটার, ফেসবুক পেজ ও গ্রুপ, ইউটিউব, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ব্লগ ইত্যাদিতে প্রচারিত বিভিন্ন উসকানিমূলক লেখা, পোস্ট, ফটো, ভিডিওর মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির অপচেষ্টা করছে।

এজহারভুক্ত লিংকগুলোর মধ্যে যেসব ফেসবুক ইউজারের নাম রয়েছে, সেগুলো হলো: Ray han, Ariful islam Jihad, Habibur Rahman, Sabin Rahman Nomun, Saidul Apu, সাইদুল ইসলাম তহিদ, Gazi Abu Yousah, Nasif Wahid Faizal ও নুরুল হক নূর। এসব ফেসবুক আইডি ছাড়াও ফেসবুক গ্রুপ, পেজ, টুইটার ও ইউটিউব লিংক রয়েছে।

এদিকে আন্দোলনকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা প্রকাশ্যে এসেছে ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকার একটি টেইলার্স থেকে সাড়ে ৪ হাজার স্কুল ড্রেস বানানোর ঘটনার মাধ্যমে। প্রকৃত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এখন স্কুল ড্রেস পরে আন্দোলনে ঢুকে পড়ছে ষড়যন্ত্রকারীরা। ট্রাকে করে ছেলে-মেয়েদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে। ট্রাকের মধ্যেই তাদের জামা পরিবর্তন করিয়ে নামিয়ে দেয়া হচ্ছে বিভিন্ন স্পটে।

ফেসবুকে ছড়ানো খবরগুলো গুজব- তা নিশ্চিত হয়ে শিক্ষার্থীদের অনেকেই গণমাধ্যমের কাছে গুজবের সত্যতা নিশ্চিত করে। ঢাকা আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থী কাজী আশিকুর রহমান তূর্য বলেন, ‘দুপুরে হঠাৎ কিছু লোক এসে বলে, আমাদের চারজন বোনকে আর ক’জন ছেলেকে আওয়ামী লীগ অফিসে আটকে রাখা হয়েছে। কিন্তু আমরা আওয়ামী লীগ অফিসে এসে দেখলাম, এমন কিছু ঘটেনি।’ পরে তূর্য আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আন্দোলনকারীদের মেরে ফেলা ও আটকে রাখার যে তথ্য আমরা পেয়েছিলাম, তা গুজব। আপনারা কেউ গুজবে কান দেবেন না।Image result for কাজী নওশাবা আহমেদ

ফেসবুকে গুজব ছাড়ানোর অভিযোগে অভিনেত্রী কাজী নওশাবা আহমেদকে ৪ আগস্ট রাতেই রাজধানীর উত্তরা থেকে আটক করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে।তিনি স্বীকার করেছেন, যে তথ্য তিনি লাইভে এসে দিয়েছিলেন তার কোন সত্যতা নেই এবং সেই সময় তিনি উত্তরা ছিলেন, শুধুমাত্র একজন এর কথা শুনে তিনি লাইভে এসে ওই সব কথা বলেছিলেন।
এদিকে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর (মাউশি) থেকে সারাদেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৫ আগস্ট থেকে ক্লাস সচল করার নির্দেশনা ও শিক্ষার্থীদের ক্লাসে মনোযোগী করতে শিক্ষকদের প্রতিও অনুরোধ করা হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশেষ উদ্দেশেই ষড়যন্ত্রকারীরা জিগাতলায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার চেষ্টা করেছিলেন। কারণ, জিগাতলার একপাশে যেমন রয়েছে পিলখানা (বিজিবি সদর দপ্তর) অন্যদিকে এখানে রয়েছে অনেকগুলো স্কুল,কলেজ এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, ফলে এখানে খুব সহজেই অনেক ছাত্র ছাত্রী পাওয়া যাবে যাদের খুব সহজেই পথভ্রষ্ট করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করা যাবে। কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীদের আশায় গুড়ে বালি দিয়ে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ছাত্র ছাত্রীরা ঠাণ্ডা মাথায় পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে

Image result for ঝিগাতলায় শিক্ষার্থীদের অবস্থান

অন্যদিকে, আন্দোলন ছেড়ে বাড়ি ফিরে যেতে ছাত্রলীগ কর্মীদের লিফলেট বিলি করতে দেখা গেছে। লিফলেটে শিক্ষার্থীদের ৯ দাফা দাবির বিপরীতে সরকারের পক্ষ থেকে ১১টি দাবি বাস্তবায়ন করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে গুজব ও বিভ্রান্তিমূলক তথ্য ছড়িয়ে ধ্বংসাত্মক কার্যক্রমের উস্কানিদাতা হিসেবে ২৮টি ফেসবুক ও টুইটার আইডি শনাক্ত করা হয়েছে। এসব আইডির মালিক ও অ্যাডমিনদের আইনের আওতায় আনতে রাতে অভিযান চালাবে পুলিশের সাইবার ক্রাইম বিভাগ।

মামলার এজাহারে যেসব ফেসবুক আইডি ও পেজের কথা উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলো হচ্ছে, জুম বাংলা নিউজ পোর্টাল, বিএনপি সমর্থক গোষ্ঠী কেন্দ্রীয় সংসদ, অ্যাক্সিডেন্ট নিউজ, বাংলামেইল৭১, বাঁশেরকেল্লা, ফাইট ফর সারভাইভার্স রাইট, ফাঁকিবাজ লিংক, আন্দোলন নিউজ।
এছাড়া টুইটার আইডিগুলো হচ্ছে- রানা মাসুম-১, নওরিন-০৭, দিপু খান বিএনপি, ইদ্রিস হোসেইন, এম আল আমিন-৯৯, বিপ্লবী কাজী, নাসিফ ওয়াহিদ ফায়জাল।