গুজবে ভাসছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো

 

গত ২৯ জুলাই শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী বাস চাপায় নিহত হওয়ার জের ধরে স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের দাবি সহ ৯ দফা দাবি নিয়ে রাজধানীতে আন্দোলনে নামে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থেকে উঠে আসা দাবিগুলো বাস্তবসম্মত ও যৌক্তিক। তাদের দাবিগুলোর যৌক্তিকতা বিবেচনায় নিয়ে সরকারও তাদের দাবিগুলোর সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেছিল। আন্দোলনরত স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতিও দেয়া হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। প্রথমবারের মতো একটি সফল কিশোর বিপ্লবের স্বাক্ষী হওয়ার অপেক্ষায়  ছিল দেশবাসী।

যখনই এই কিশোর বিপ্লব সফলতার দ্বারপ্রান্তে অবস্থান করছিলো, তখনই এই আন্দোলন থেকে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্য কোমলমতি শিশুদের এই আন্দোলনকে ঘিরে বিভিন্ন ধরণের গুজব ও অপপ্রচারে লিপ্ত হয়ে পড়ে কুচক্রী মহল। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে বিভিন্ন ধরণের বানোয়াট খবর ও ছবি প্রকাশ করে এই আন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়ে পড়ে ষড়যন্ত্রকারীরা।

গত শনিবার ধানমন্ডিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর কিছু বহিরাগত সন্ত্রাসী হঠাৎ করেই হামলা চালায়। শুধু শিক্ষার্থীদের উপর হামলা করেই ক্ষান্ত হয়নি সন্ত্রাসীরা, তারা আওয়ামী লীগের সভানেত্রীর কার্যালয়েও ভাঙচুর শুরু করে।

হামলাকারীদের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় হামলার পূর্বে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরুর ফাঁসকৃত ফোনালাপ থেকে। বিএনপির এই নেতার ফোনালাপ থেকে জানা যায় তিনি বিএনপির কর্মীদের এই আন্দোলনে শরিক হয়ে নাশকতা সৃষ্টির নির্দেশ প্রদান করেছেন। এই নির্দেশের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে নাশকতা করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলে রাজনৈতিক ফায়দা লোটা। এর আগে কোটা আন্দোলন নিয়েও রাজনৈতিক ফায়দা লোটার প্রমাণ মিলে তারেক জিয়ার সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থী এক শিক্ষকের ফাঁসকৃত ফোনালাপ থেকে।

আন্দোলন নিয়ে বিএনপি নেতার ফোনালাপ ফাঁস হয়ে বিতর্কের জন্ম দেয়

শিক্ষার্থীদের উপর হামলার পরপরই গুজবে ছেয়ে যায় সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো। বিএনপি জামায়াতের বিভিন্ন ফেসবুক পেজ ও গ্রুপ থেকে বিভিন্ন ধরণের গুজব ও অপপ্রচারের মাধ্যমে আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে নেয়ার কার্যক্রমে লিপ্ত হয় বিএনপি জামায়াত নেতাকর্মীরা।

আন্দোলনে শিবির নেতা রাতুল

ফেসবুকে ছড়ানো তাদের গুজবের অন্যতম ছিল ছাত্রলীগ কর্তৃক ধানমন্ডিতে ৪ জন শিক্ষার্থীকে গুলি করে হত্যা ও ৪ জন কলেজ ছাত্রীকে ধর্ষণ করে হত্যা করা। প্রমাণ হিসেবে তারা বিভিন্ন ধরণের পুরাতন ছবি প্রকাশ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। তথাকথিত কিছু মিডিয়া ব্যক্তিত্বও তাদের ফাঁদে পা দিয়ে এই ধরণের গুজব ছড়ানো শুরু করে।

‘স্কুল ছাত্র’ নামে এরা কারা?

এই গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করে জানানো হয় যে শিক্ষার্থী নিহত হওয়া এবং ধর্ষণের শিকার হওয়ার খবরটি গুজব ছাড়া আর কিছুই নয়। তারা দেশবাসীকে কোনোপ্রকার গুজবে কান না দেয়ার আহবান জানান।

সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকারী ছাত্রদের একাংশ

বিএনপি জামায়াতের ফেসবুক পেইজ ও গ্রুপ থেকে যেসব শিক্ষার্থীদের মৃত্যুর গুজব ছড়ানো হয়েছিলো পরবর্তীতে উক্ত শিক্ষার্থীরা ফেসবুক লাইভ এসে তাদের নিহত হওয়ার গুজব উড়িয়ে দিয়েছে।

এই ছেলেটিকে আন্দোলনে নিহত বলে দাবি করা হয়েছিল

চলতি বছরের জুলাই মাসে ভারতের কলকাতায় ধর্ষণের শিকার হয়ে নিহত হওয়া এক মেয়ের ছবিকে তারা ধানমন্ডিতে ধর্ষণের শিকার হওয়া কলেজ ছাত্রী বলে দাবি করে।

২০১৪ সালে সৌদিআরবে নির্যাতনের শিকার হওয়া এক মেয়ের ছবিকেও তারা ধানমন্ডিতে নির্যাতনের শিকার হওয়ার মেয়ের ছবি বলে প্রকাশ করে।

এছাড়া গত জানুয়ারি মাসে ভারতের জম্মুতে পানিতে ভেসে উঠা এক মহিলার লাশের ছবি প্রকাশ করে তা ধানমন্ডি লেকে ভেসে উঠা কলেজ ছাত্রীর লাশ বলে প্রচার করে।

এছাড়া এর আগে ব্যক্তিগত মেসেঞ্জার ও গ্রুপ মেসেঞ্জারে একটি গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল যা ভাইরাল হয়ে পড়ে। সেখানে একজন সাংবাদিক এবং এক মন্ত্রীর খুব কাছের একজন-এর বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, ‘রবিবার স্কুল শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা এবং যৌন নির্যাতন চালানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। আগামী রবিবার মন্ত্রী এমপিরা ১০০০-১৫০০ বস্তির ছেলেকে রাস্তায় নামাবে। যাদের কাজ হবে মেয়েদের যৌন নির্যাতন করা, গাড়ি ভাঙা, গাড়িতে আগুন দেওয়া। আর এই ঘটনার প্রতিবাদে পুলিশ সাধারণ ছাত্রদের উপর আক্রমণ চালাবে। ফলাফল ছাত্রদের উপর সাধারণ মানুষ খেপবে।’

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারে ছড়িয়ে পড়া আরেকটি গুজব

শনিবার (০৪ আগষ্ট) বিকেলে ফেসবুক লাইভে এসে ঝিগাতলায় এক শিক্ষার্থীর চোখ তুলে ফেলা হয়েছে এবং দুই শিক্ষার্থীকে মেরে ফেলা হয়েছে বলে দাবি করেন অভিনেত্রী নওশাবা। কিন্তু তাঁর এই বক্তব্যের সত্যতা মেলেনি। সরকার বিরোধী চক্রের এজেন্ডা বাস্তবায়নেই কী এই তারকা অভিনেত্রী এমন অপপ্রচার চালিয়েছেন কীনা এ নিয়েও প্রশ্ন ওঠেছে। প্রশ্ন ওঠেছে, অভিনেত্রী নওশাবার ছড়ানো এই গুজবের সঙ্গে রাজধানীর ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ অফিসে হামলার ঘটনার সম্পৃক্ততা থাকতে পারে। এদিন দুপুর দেড়টার দিকে প্রায় দুই শতাধিক তরুণ ধানমন্ডি ৩/এ অফিসে লাঠিসোটা ও ইটপাটকেল ছুঁড়ে হামলা চালায়। এরপরই গোয়েবলসীয় কায়দায় এমন অপপ্রচার চালান বিতর্কিত এই অভিনেত্রী। এর প্রেক্ষিতে ৱ্যাবের একটি দল নওশাবাকে গ্রেপ্তার করে, পরবর্তীতে ৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়।

গুজব ছড়ানোয় অভিনেত্রী নওশাবা আটক

জানা যায়, শনিবার (০৪ আগষ্ট) দুপুরে রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় শিক্ষার্থীদের পোশাক পরা কিশোর ও তরুণরা সড়কে অবস্থান নিয়ে অবরোধ তৈরি করে। এর কিছুক্ষণ পরই ‘এক জনের পায়ের রগ কেটে দেয়া হয়েছে’ এমন গুজব ছড়ানো হয়। এ সময় দুই শতাধিক তরুণ দৌড়ে জিগাতলার দিকে আসতে থাকে। তারা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে এবং সেখানে উপস্থিত কর্মীদেরকে ধাওয়া দেয়। অফিসে ঢোকার আগে মূল রাস্তায় তাদেরকে বাধা দিলে হামলাকারীরা ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। সরকার বিরোধী গ্রূপের এমন তান্ডবে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় জিগাতলা এবং আশপাশের এলাকা।

আন্দোলনে বিএনপির চিহ্নিত নেতা

 

এদিকে বাস চাপায় নিহত দুই শিক্ষার্থীর পরিবারকে গণভবনে ডেকে নিয়ে তাদের সমবেদনা জানানোর পাশাপাশি তাদের হাতে আর্থিক সঞ্চয়পত্র তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী । পাশাপাশি ঘাতক বাস চালক ও হেলপারের  বিচারের বিষয়েও আশ্বস্ত করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সরকার প্রধানের কাছ থেকে আশ্বাস পেয়ে তারা শিক্ষার্থীদের আন্দোলন স্থগিত করে ঘরে ফিরে যাওয়ার আহবান জানান। সরকারের কাছ থেকে তাদের ৯ দফা দাবি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি পেয়ে যখন শিক্ষার্থীরা ঘরে ফেরা শুরু করেছিল, ঠিক তখনই এসব গুজব ও অপপ্রচার করে এবং বিভিন্ন রকম উস্কানি দিয়ে আন্দোলনের মহৎ উদ্দেশ্যকে বানচাল করে দিয়েছে কুচক্রী মহল।

ছাত্র আন্দোলনে এদের উদ্দেশ্য কি?

প্রায় এক যুগ ধরে ক্ষমতার বাইরে বিএনপি। বিভিন্ন ইস্যুতে আন্দোলন করে জনসমর্থন আদায়ে ব্যর্থ হয়ে তারা এখন নিরাপদ সড়কের দাবিতে স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ দিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার পাঁয়তারা শুরু করেছে। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ডানায় ভর করে ক্ষমতায় যেতে চায় বিএনপি। এমনটাই মনে করেন দেশের একাধিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

 

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আরো কিছু গুজব এবং বিতর্কিত বিএনপি নেতাদের অংশ গ্রহণের প্রমাণ:

বোরখা পরা মেয়েটি কোটা আন্দোলন নেত্রী লুমা সরকার

 

 

আন্দোলনে মায়ের অভিনয়ে বিএনপি নেত্রী: কি চায় এরা?

 

নকল স্কুল ড্রেসের ভিতরে আসল পোশাক

 

অন্য একটি ঘটনার ছবি গতকালকের বলে ভাইরাল করা হয়